
ক্রাইম ডেস্ক:গোয়াইনঘাট থেকে ফিরে; আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সরগরম হয়ে উঠেছিলো সিলেট জেলার গোয়াইনঘাট উপজেলা বিএনপি।ক্ষমতার পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গেই যেন শুরু হয়েছে একাংশের রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল ও অবৈধ লুটপাটের প্রতিযোগিতা।স্থানীয় কিছু নেতাকর্মী ও সিন্ডিকেটের হাত ধরে উপজেলাজুড়ে চলছে চাঁদাবাজি,সীমান্ত চোরাচালান ও সরকারি সম্পদ দখলের মহোৎসব।
উপজেলা জুড়ে ইজারার নামে চলছে বালু-পাথর লুটপাট ও ফসলি জমি ধ্বংসের উৎসব।
অনুসন্ধানে জানা গেছে,বিছনাকান্দি বালুমহাল ইজারার দোহাই দিয়ে ইজারা-বহির্ভূত এলাকা থেকে অবৈধভাবে বালু ও পাথর লুটপাট করছেন একটি সিন্ডিকেট চক্র,এতে সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ও বিএনপি নেতা শাহ্ আলম স্বপনের বিরুদ্ধে বালু-পাথর লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে।
হাজীপুর বালুমহাল ও জাফলং চা বাগান:হাজীপুর বালুমহালের নাম ভাঙিয়ে ইজারাদার ও ভূমিদস্যুরা সাবাড় করে দিচ্ছে জাফলং চা বাগানের নিজস্ব জমি।কয়েক কোটি টাকার অবৈধ রয়্যালিটি আদায়ের উদ্দেশ্যে হেঁটে পার হওয়া এক সময়ের ছোট্ট খালটিকে তারা বানিয়ে ফেলেছে বিশাল জলাশয়ে,বিপাকে পড়েছেন হাজার হাজার স্কুল কলেজ ও মাদ্রাসায় পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা।
লেঙ্গুড়া বালুমহাল, বালির হাওড় ও কুটরঘাট:লেঙ্গুড়া বালুমহালের ইজারা রশিদ ব্যবহার করে বিএনপি নেতা নামধারী একটি সিন্ডিকেট নদীগর্ভে বিলীন করছে বালির হাওড় ও কুটরঘাটের শত শত বিঘা ফসলি জমি। অবৈধভাবে উত্তোলিত এসব বালু বৈধ করতে প্রতি ঘনফুটে আদায় করা হচ্ছে ৫ টাকা করে রয়্যালিটি।
ভুয়া ইজারার নামে চাঁদাবাজি:’সারী-১’ নামে গোয়াইনঘাটে কোনো বালুমহালের সরকারি ইজারা না থাকলেও,তিতারাই এলাকায় নৌযান আটকে রয়্যালিটির নামে চলছে প্রকাশ্য চাঁদাবাজি দিশেহারা প্রশাসন।
জাফলংয়ের ইসিএ এলাকা সাবাড় ও পুলিশের অনৈতিক যোগসাজশ প্রতিরাতে লাখ লাখ ঘনফুট বালু চুরি:জাফলংয়ের পরিবেশগতভাবে সংকটাপন্ন (ইসিএ) এলাকা—নয়াবস্তি, কান্দুবস্তি,জুমপাড় ও বল্লাঘাটে প্রতিদিন রাতে বসছে শত শত নিষিদ্ধ শ্যালো ইঞ্জিন(সেভ মেশিন)।প্রতিদিন অন্তত ২ থেকে ৩ লাখ ঘনফুট বালু ও পাথর লুট হচ্ছে।
অভিযোগ উঠেছে,এসব অবৈধ সেভ মেশিন থেকে ‘কালা শামসুল’নামে পুলিশের পরিচিত এক লাইনম্যানের মাধ্যমে মেশিনপ্রতি ১,০০০ টাকা করে চাঁদা আদায় করছে একটি সিন্ডিকেট চক্র।
নৌপথে চাঁদাবাজির সাম্রাজ্য
ইউনিয়ন পরিষদের নামে রয়্যালটি: উপজেলার অন্তত ৭টি ইউনিয়ন পরিষদের ভুয়া বা অননুমোদিত রশিদ ব্যবহার করে বালুবাহী নৌযান থেকে চলছে বেপরোয়া চাঁদাবাজি।একেকটি বড় নৌযান থেকে ৫,০০০ টাকা এবং ছোট নৌকা থেকে ৩,০০০ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে একটি চক্রের বিরুদ্ধে।
নৌ পথে চাদাবাজির ১০% কমিশন বাণিজ্য:নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তথ্যদাতারা নিশ্চিত করেছেন,ইউনিয়ন পরিষদের নামে সংগৃহীত এই অবৈধ চাঁদার দৈনিক ১০ শতাংশ সরাসরি চলে যায় স্থানীয় থানা পুলিশের পকেটে।
সীমান্ত চোরাচালান ও সড়ক পথের দখলদারি,ভারতীয় গরুর ট্রানজিট পয়েন্ট: ১১ নং মধ্য জাফলং ইউনিয়নের রাধানগর পশুর হাটে প্রতিদিন সীমান্ত পেরিয়ে আসা শত শত চোরাই ভারতীয় গরুকে ভুয়া রশিদ দিয়ে বৈধতা দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে ইজারাদার প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে।
যুবদল নেতার নিয়ন্ত্রণে চোরাচালানের লাইন:১১নং মধ্য জাফলং ইউনিয়ন যুবদল নেতা রিয়াজের নেতৃত্বে পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার ভারতীয় পণ্য ঢুকছে সিলেটে।ভারতীয় কসমেটিকস,জিরা,চিনি,স্মার্টফোন ও মোটরসাইকেলের পাশাপাশি আসছে বিদেশি মদ, ইয়াবা ও ফেনসিডিল।
লাইনম্যান বাণিজ্য:পুলিশ চেকপোস্ট পার করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতিতে যুবদল নেতা রিয়াজ প্রতি মালামালবাহী ডিআই পিকআপ থেকে আদায় করে আসছে দশ হাজার টাকা করে।তার মাধ্যমে গোয়াইনঘাট থানা ও পুলিশ চেকপোস্ট ডিঙ্গিয়ে দৈনিক অন্তত ১০০টিরও বেশি গাড়ি এভাবে নির্বিঘ্নে শহরের দিকে পাড়ি জমায়।
প্রশাসনের ভূমিকা ও ভুক্তভোগীদের হাহাকার,অবৈধ রয়্যালিটি ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে নৌ ও জাহাজি শ্রমিকেরা বারবার প্রতিবাদ ও আন্দোলন করলেও রহস্যজনকভাবে নীরব উপজেলা প্রশাসন।মাঝে মাঝে লোকদেখানো অভিযান চালানো হলেও মূল অপরাধীরা থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে;সাজা পোহাতে হয় কেবল খেটে খাওয়া দিনমজুরদের।স্থানীয় সচেতন মহলের মতে,গোয়াইনঘাটের চলমান এই পরিস্থিতি যেন অবিকল—’কুপির নিচে অন্ধকার’।























